ক্রেডিট ইউনিয়নের বাস্তবতা ও কিছু কথা

ফাদার দিলীপ এস কস্তা
পাল—পুরোহিত, বনপাড়া ধর্মপল্লী

০১. ক্রেডিট ইউনিয়ন প্রসঙ্গে কথা

খুব সহজ কথায় বলতে গেলে ক্রেডিট ইউনিয়ন হলো বিশ্বাসের সংস্থা বা সমিতি। পারস্পারিক বিশ্বাস, জানা, শোনা নির্দিষ্ট এলাকার সদস্যদের নিয়ে ক্রেডিট ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে ক্রেডিট ইউনিয়নের স্বপ্ন দ্রষ্টা হলেন আমেরিকান মিশনারী আর্চবিশপ লিও লরেন্স গ্রেনার, সি.এস.সি। তাঁর স্বপ্ন ও দূরদর্শী পরিকল্পনাকে বাস্তবের রূপ দেবার প্রচেষ্টায় নেমে ছিলেন, আরেক আমেরিকান মিশনারী ফাদার চালর্স জে. ইয়াং সি.এস.সি। তাঁদের প্রচেষ্টা ও আরো উদার ব্যক্তির সহভাগিতায় ‘ক্রেডিট ইউনিয়ন’ গড়ে উঠেছে সমগ্র বাংলাদেশে। সকল ধর্মপল্লীতেই প্রথমত ধর্মপল্লীর যাজকদের অনুপ্রেরণা, সহযোগিতা ও উদারতার গুণে প্রায় প্রতিটি ধর্মপল্লীতে ক্রেডিট ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ধর্মপল্লীর যাজক ভবন ও গীর্জার বারান্দায় এক সময় ক্রেডিট ইউনিয়নের লেনদেন, সভা—মিটিং পরিচালিত হতো। দিন বদলের সাথে সাথে মানুষ সচেতন হয়েছে; ভূত—ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ক্রেডিট ইউনিয়নকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে। কম—বেশী অনেক ধর্মপল্লীর ক্রেডিট ইউনিয়নের আর্থিক অবস্থা ভাল। এক সময়ের পরিচিত ‘ঋণ দান’ সমিতি বর্তমানে ক্রেডিট ইউনিয়ন নামে সবার নিকট পরিচিত। ক্রেডিট ইউনিয়ন ‘লোন’ কার্যক্রমসহ নানাবিধ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

‘ক্রেডিট ইউনিয়ন’ মাধ্যমে আমাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বাড়ী—ঘরসহ নানা রকম কাজে উন্নতি হয়েছে। মন্ডলীর উন্নয়ন চিন্তা হলো একজন ব্যক্তির সার্বিক উন্নয়ন অর্থাৎ আধ্যাত্নিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও মানবিক। সমন্বিত উন্নয়ন হলো ব্যক্তি মানুষের ‘সামগ্রিক উন্নয়ন’। সামগ্রিক উন্নয়নের চিন্তাকে সামনে রেখে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে সামনের দিকে

০২. ক্রেডিট ইউনিয়ন ও ধর্মপল্লীর মধ্যে সুসম্পর্ক যীশুর শিক্ষা হলো ‘ঈশ্বর ও প্রতিবেশীকে নিজের মতোই ভালবাসবে’ আর পারস্পরিক ভালবাসার বন্ধনের মাধ্যমেই সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের ক্রেডিট ইউনিয়ন এখনো ধর্মপল্লীর চত্ত্বরেই বিরাজমান। ধর্মপ্রদেশীয় ক্রেডিট ইউনিয়ন বিষয়ক নীতি—মালাতেও ধর্মপল্লীর সাথে ক্রেডিট ইউনিয়নের সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পালকীয় অগ্রাধিকারের মধ্যেও ক্রেডিট ইউনিয়ন একটি অন্যতম আর্থ—সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। খ্রীষ্টমন্ডলী হলো বিশ্বাসী ভক্তমন্ডলীর সমাবেশ অন্য দিকে ক্রেডিট ইউনিয়ন হলো খ্রীষ্টভক্তদের পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠান । ‘বিশ্বাস’ যেমন মানুষকে ঈশ্বরমুখী করে তেমনি একজন ক্রেডিট সদস্য বিশ্বাসের গুণে দায়িত্ববান সদস্য তথা নেতা হয়ে উঠে। এছাড়া খ্রীষ্টীয় নেতৃত্ব অনুশীলনের অন্যতম স্থান হলো ‘ক্রেডিট ইউনিয়ন’। বাংলাদেশ খ্রীষ্ট—মন্ডলীতে প্রায় শতভাগ ক্রেডিট ইউনিয়ন এখন ধর্মপল্লীকে কেন্দ্রিক বা ধর্মপল্লীর চত্বরেই বিরাজমান। কিন্তু সংখ্যক ক্রেডিট ইউনিয়ন ধর্মপল্লীর চত্বরের বাইরে তবে ধর্মপল্লীর সাথে বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সম্পর্ক যুক্ত। ধর্মপল্লী হলো বিশ্বাসের মিলন ভূমি যা আমরা সমবেতভাবে উপাসনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রকাশ করি। আর ক্রেডিট ইউনিয়ন সাথে যুক্ত থাকি, বিশ্বাসের কারণে, উন্নয়ন ও নির্ভরশীল ব্যক্তি মানুষ হবার লক্ষ্যে। ‘একজন ভাল ক্রেডিট ইউনিয়ন সদস্য একজন ভাল খ্রীষ্টানও’ অথার্ৎ ঈশ্বর ও মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা রাখার কারণে সৎ ও বিশ্বাসী মানুষ হয়ে উঠে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক ও মধুর করে তোলে। ধর্মপল্লী ও ক্রেডিট ইউনিয়ন এক খ্রীষ্টে বিশ্বাসী এবং পারস্পরিক সহযোগিতা, সহভাগিতার মাধ্যমে সর্বদাই সুসম্পর্ক বজায় রেখে পথ চলবে এই প্রচেষ্টা যেন সবার মধ্যে থাকে।

০৩. ক্রেডিট ইউনিয়ন বাস্তবতা বাংলাদেশে ১১০টি মতো ধর্মপল্লী রয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু সংখ্যক উপ— ধর্মপল্লী রয়েছে। বলা যায়, প্রায় প্রতিটি ধর্মপল্লীতে ক্রেডিট ইউনিয়ন রয়েছে। এছাড়া কিছু সংখ্যাক উপধর্মপল্লী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ক্রেডিট ইউনিয়ন রয়েছে। বেশীর ভাগ সমিতিই ক্রেডিট শেয়ারের চাইতে, সঞ্চয়, ফিক্সড ডিপোজিটসহ অন্যান্য প্রকল্পের অর্থ বেশী। সার্বিক ভাবে বলতে গেলে ‘ক্রেডিট ইউনিয়ন’ গুলি ভালই চলছে। অন্য একটি বাস্তবতা হলো বাঙ্গালী এলাকার ক্রেডিট ইউনিয়নগুলো মূলধনের পরিমান অনেক বেশী। তবে সব সমিতিতেই ছোট—খাট সমস্যা রয়েছে। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও ঋণের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যই মিশনারী ও স্থানীয় ধর্মযাজকগণ ‘ক্রেডিট ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করতে মূখ্য ভূমিকা পালন ছিলেন। দিন বদলের সাথে সাথে অর্থের পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে, সঞ্চয় ও প্রকল্পের সংখ্যা ও বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিক ক্রেডিট ইউনিয়ন পরিচালনায়, দলাদলি, অসততা, ব্যক্তিগত আক্রোশসহ নানাবিধ সমস্যা তৈরী হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ‘ক্রেডিট ইউনিয়ন’ পরিচালনার জন্য নেতা—নেত্রী পাওয়া যেত কম এমনকি এক ব্যক্তি বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতো। সমিতিগুলি সচ্ছ্বল হবার সাথে সাথে নেতৃত্বের দ্বন্দ, রেষারেষি, দলাদলির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমবায় নিয়ম—নীতি পালনেও কোন ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ও বিপত্তি হচ্ছে। ক্রেডিট ইউনিয়নগুলির মধ্যে খ্রীষ্টীয় মূল্য—বোধ ও ভাব—ধারা ক্ষুন্ন হচ্ছে। ক্রেডিট ইউনিয়নগুলিতে দলাদলি—ভাঙ্গন, রেষারেষি যেন সৃষ্টি না হয় সেই দিকে অবশ্যই আমাদের নজর রাখতে হবে।

০৪. ক্রেডিট ইউনিয়ন নিবার্চন প্রসঙ্গে নেতা হয়ে কেহ জন্মায় না কিন্তু ব্যক্তির কাজ—কর্ম, সাহসীকতা, সহযোগীতা কল্যাণ কাজসহ নানাবিধ সামাজিক কাজের মাধ্যমে নেতা হয়ে উঠে। ক্রেডিট ইউনিয়নের নেতৃত্ব আসে সমবায়ের নিয়ম—নীতি অনুসারে। যীশু বলেন “ সে তো সেবা পাবার জন্য আসেনি, এসেছে সেবা করতে এবং বহু মানুষকে মুক্তিতান হিসেবে প্রাণ বিসর্জন দিতে” (মথি ২০: ২৮)। খ্রীষ্টিয় নেতৃত্ব হলো সেবার, ভালবাসার ও অন্যের কল্যাণ সাধনের। ক্রেডিট ইউনিয়নে ‘পরিচালনা পরিষদ’ গঠন নিবার্চনের মধ্য দিয়ে হতে পারে। আবার তা চাইলে সমঝোতার মাধ্যমে মনোননের মাধ্যমে হতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতা নির্বাচনের প্রাধান্য অনেক বেশী। বড় বড় সমিতিগুলোতে এখন প্যানেল ভিত্তিক নিবার্চন করা হয়। ফলে দল বা প্যানেল গড়ে উঠে এবং নিবার্চনী প্রচারনা উৎসব মুখর ব্যাঞ্জনায় অনুষ্ঠিত হয়। বাস্তবতায় লক্ষনীয় যে নিবার্চনে সময় প্রচুর অর্থ ও সময় অপচয় হয় এবং সমিতির সদস্যদের মধ্যে দলাদলি রেষারেষি বৃদ্ধি পায় । এই বাস্তবতা থেকে উত্তরনের পথ খুঁজে বের করতে হবে। সহনশীল মনোভাব, সমবোঝা এবং পারস্পারিক সম্মান, আলাপ—আলোচনা ও শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়ে নিবার্চন পরিহার করা সম্ভব । কোন ‘পরিচালনা পরিষদ’ই চিরকালের বা দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়। নিির্দষ্ট সময় অতিক্রমের পর অন্য পরিষদ দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাই সমিতির সকল সদস্যকেই সচেতন থাকতে হবে এবং প্রকল্প প্রণয়ন, লোন লেন দেন দেয়ার পদ্ধতিগুলি বাস্তব ভিত্তিক হতে হবে যা সমিতি যেন কখনই ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। ‘লোন কার্যক্রম’ কে বাস্তবভিত্তিক বিচার—বিশ্লেষণের মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত দিতে হবে। ঋণ খেলাপি (উবভধঁষঃবৎ) সংখ্যা যেন সমিতিতে স্থান না পায়। সমিতি পরিচালনায় ‘লেন—দেন’ কার্যক্রমটি অতি গুরুত্বপৃর্ণ এবং সঠিক লেন—দেনের উপর সমিতি টিকে থাকে এবং উন্নয়ন সাধিত হয়। এক সময় ক্রেডিট ইউনিয়ন আমাদেরকে বাঁচিয়েছে সঠিকভাবে লেন—দেন কার্যক্রম করার ফলে। লেন—দেন কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে সমিতিকে আমরা বাঁচিয়ে বা টিকিয়ে রাখতে পারবো না।

০৫. সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর করার সময় এখনই প্রচলিত কথা, ‘সময় ও ে¯্রাত কারো জন্য অপেক্ষা করে না’। সময় প্রবাহ মান, আপন গতিতে এগিয়ে যায়। তাই সময় থাকতে সঠিক কাজটি করতে হয়। বেশ কিছু সমিতি রয়েছে যেগুলিতে লেন—দেন কার্যক্রম স্থগিত হয়ে আছে বা লেন দেন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ‘ক্রেডিট ইউনিয়ন’ আমাদের বেঁচে থাকার পথ বা উপায় দেখিয়েছে । বর্তমানে কিন্তু লোন বা ঋণের অর্থ যথাযথ বা সঠিক ভাবে ব্যবহার না করার ফলে, অনেকেই ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। ঋণের ভারে স্থাবর—অস্থাবর সম্পত্তি হাত ছাড়া করতে বাধ্য হচ্ছে অনেকে । লোন দেবার বিষয়টি বা পদ্ধতি নিয়ে বিচার—বিশ্লেষণ করতে হবে যেন বিপদের সময় সমিতির সদস্য উপকৃত হয় আবার সমিতি যেন কোন ভাবেই ক্ষতিগ্রন্থ না হয়। লোন নিয়ে যথা সময়ে লোন না দেবার প্রবনতা অনেকের মধ্যে রয়েছে। ‘ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে সমিতির স্বার্থ’ এই নীতি ও মূল্যবোধ বিশেষভাবে পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে থাকতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ব্যক্তি ও সমিতির উভয়ের জন্যই মঙ্গল। তাই ক্রেডিট সমিতিতে বিশ্বাস, ভালবাসা ও সহভাগিতার সমিতি হিসাবে গতিশীল রাখতে হবে। খ্রীষ্টমন্ডলীর স্বপ্ন ও প্রচেষ্টা ছিল ক্রেডিট ইউনিয়নের মাধ্যমে আত্ম—নির্ভরশীল সমাজ গড়ে তোলা এবং মিলন—একতা—বিশ্বাসের ভিত্তিতে পরিচালনা করা। মূল শিক্ষা বা শিকর থেকে যেন ‘ক্রেডিট ইউনিয়ন’ সরে না যায় সেদিকে অবশ্যই নজর রাখতে হবে। ‘ক্রেডিট ইউনিয়ন আমাদের বাঁচিয়েছে—আমরা ক্রেডিট ইউনিয়নকে বাঁচিয়ে রাখবো’ এবং উন্নতির শিখরে আরোহন করবো এই প্রত্যাশা ও প্রচেষ্টা আমাদের সকলের। দীক্ষিত খ্রীষ্টভক্ত হিসাবে আমরা এক খ্রীষ্ট ও এক দীক্ষায় বিশ্বাসী এবং বিশ্বাসের সমিতি ক্রেডিট ইউনিয়কে ভালবাসবো,পরস্পরকে বিশ্বাস করবো, একতা ও সংহতি নিয়ে এগিয়ে যাবো স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। খ্রীষ্টিয় নেতৃত্ব, সততা, বিশ্বাস ও একতার পথ ধরে ক্রেডিট ইউনিয়ন এগিয়ে যাক সুদূর সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে। সমমন—সমবিশ্বাস আর সহভাগিতার পথ ধরে, আমরা খ্রীষ্ট পথিক এগিয়ে যাবো ক্রেডিট ইউনিয়নকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে, ‘দিবো আর নিবো’ জনে জনে বিশ্বাস—ভালবাসা আর সহভাগিতায়ময় জীবনে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top